জমির নামজারি কী? নতুন নিয়ম, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও সময়সীমা

জমি কেনার পর অথবা উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পাওয়ার পর শুধু দলিল হাতে থাকলেই কাজ শেষ নয়। সরকারি ভূমি রেকর্ড বা খতিয়ানে নিজের নাম অন্তর্ভুক্ত করাও গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়াকেই বলা হয় নামজারি বা মিউটেশন

বাংলাদেশের ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, উত্তরাধিকার বা রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে জমির মালিকানা পরিবর্তন হলে সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করার জন্য নামজারি করা হয়।

নামজারি কী?

সহজভাবে বললে—

জমি কেনার পর আগের মালিকের পরিবর্তে নতুন মালিকের নাম সরকারি খতিয়ানে অন্তর্ভুক্ত করাই নামজারি।

আবার কেউ মারা গেলে তাঁর ওয়ারিশদের নামে জমির রেকর্ড হালনাগাদ করাও নামজারির মাধ্যমে করা হয়।

বর্তমানে নামজারির আবেদন অনলাইনে করা যায়। ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-মিউটেশন ব্যবস্থায় আবেদন, ফি প্রদান, তদন্ত, আদেশ এবং খতিয়ান পাওয়ার প্রক্রিয়া ডিজিটালভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

২০২৫ সালের নতুন নিয়মে কী পরিবর্তন এসেছে?

উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমির নামজারি নিয়ে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভূমি মন্ত্রণালয় একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছে।

এর মূল বিষয় হলো—একজন ব্যক্তি মারা গেলে তাঁর সব ওয়ারিশ চাইলে একই খতিয়ানে যৌথভাবে নামজারি করতে পারবেন

অর্থাৎ, জমি ভাগ না করেও সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে তোলা যাবে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যেক ওয়ারিশের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ থাকবে। শুধু যৌথ নামজারির জন্য বণ্টননামা দলিল বাধ্যতামূলক নয়।

উদাহরণ

ধরুন, রহিম সাহেব মারা যাওয়ার পর তাঁর ৩ জন ওয়ারিশ—করিম, সালমা ও রিনা।

তাঁরা যদি জমি নিজেদের মধ্যে ভাগ না করেন, তাহলে তিনজনের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে নামজারি করা যাবে এবং প্রত্যেকের প্রাপ্য হিস্যা উল্লেখ থাকবে।

অন্যদিকে, তাঁরা যদি জমি ভাগ করে প্রত্যেকে আলাদা অংশ নিতে চান, তাহলে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা/বণ্টনের ভিত্তিতে পৃথক নামজারি করা যাবে।

নামজারি না করলে কী সমস্যা হতে পারে?

নামজারি না করলে আপনার বৈধ দলিল থাকলেও সরকারি রেকর্ডে আগের মালিকের নাম থেকে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সম্ভাব্য সমস্যা

  • সরকারি রেকর্ডে আপনার নাম না থাকার কারণে মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হতে পারে।
  • একই জমি নিয়ে একাধিক ব্যক্তি দাবি করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
  • ভবিষ্যতে জমি বিক্রি বা হস্তান্তরের সময় সমস্যা হতে পারে।
  • উত্তরাধিকারীদের মধ্যে জমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে রেকর্ড যাচাই জটিল হতে পারে।
  • ভূমি উন্নয়ন কর ও হোল্ডিং সংক্রান্ত রেকর্ড হালনাগাদে সমস্যা হতে পারে।
  • সময়মতো নামজারি না করলে জাল কাগজপত্র তৈরি করে একই জমি নিয়ে প্রতারণার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের সরকারি নির্দেশনাতেও সময়মতো নামজারি না করলে একই জমি নিয়ে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে জটিলতা তৈরির আশঙ্কার কথা বলা হয়েছে।

তাই জমি কেনার পর বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়ার পর দ্রুত নামজারি করে রেকর্ড হালনাগাদ করা নিরাপদ।

আগে নামজারি করা থাকলে কি আবার করতে হবে?

না।

আপনার নাম যদি ইতোমধ্যে সঠিকভাবে নামজারি হয়ে থাকে এবং খতিয়ানেও তথ্য সঠিক থাকে, তাহলে সাধারণভাবে একই কারণে আবার নতুন করে নামজারি করার প্রয়োজন নেই।

তবে পুরোনো রেকর্ড ডিজিটাল সিস্টেমে সঠিকভাবে সংরক্ষিত/হালনাগাদ আছে কি না, তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।

নামজারির জন্য কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

জমির ধরন ও মালিকানা কীভাবে অর্জিত হয়েছে তার ওপর প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কিছুটা ভিন্ন হতে পারে।

সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে—

ক্রয়সূত্রে নামজারি

১. রেজিস্ট্রি দলিলের কপি
২. পূর্ববর্তী খতিয়ান/পর্চার কপি
৩. জমির দাগ ও খতিয়ান নম্বর
৪. আবেদনকারীর জাতীয় পরিচয়পত্র
৫. প্রয়োজনীয় অন্যান্য মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র
৬. প্রযোজ্য ফি প্রদানের তথ্য

উত্তরাধিকারসূত্রে নামজারি

১. ওয়ারিশ সনদ
২. মৃত ব্যক্তির মৃত্যুসনদ—প্রযোজ্য ক্ষেত্রে
৩. পূর্ববর্তী খতিয়ান/পর্চা
৪. মৃত ব্যক্তির মালিকানার দলিল/প্রমাণক
৫. সব ওয়ারিশের নাম, এনআইডি ও প্রয়োজনীয় তথ্য
৬. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে বণ্টননামা
৭. অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ই-নামজারি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় তথ্য বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে তা নির্দিষ্ট করে আবেদনকারীকে সরবরাহের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। শুধু হার্ড কপি জমা না দেওয়ার কারণে আবেদন বাতিল করার কথা নয়।

নামজারি করতে কতদিন সময় লাগে?

বর্তমান সরকারি ই-মিউটেশন সিস্টেমে নামজারি নিষ্পত্তির ধাপভিত্তিক গড় সময় প্রকাশ করা হয়েছে।

সরকারি মিউটেশন পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী—

  • আবেদন জমা → অনলাইনে
  • প্রথম আদেশ → গড়ে ২ কার্যদিবস
  • ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রতিবেদন → গড়ে ৯ কার্যদিবস
  • পরবর্তী আদেশ/শুনানির প্রস্তুতি → গড়ে ৪ কার্যদিবস
  • শুনানি ও সিদ্ধান্ত → গড়ে ১১ কার্যদিবস
  • অনুমোদনের পর খতিয়ান প্রস্তুত → গড়ে ৩ কার্যদিবস

অর্থাৎ, সরকারি পোর্টালে দেখানো ধাপগুলোর সময় যোগ করলে মোট প্রক্রিয়াটি প্রায় ২৯ কার্যদিবসের মতো হতে পারে। তবে এটি ধাপভিত্তিক গড় সময়; কোনো মামলায় তথ্যের ঘাটতি, আপত্তি, বিরোধ বা অতিরিক্ত যাচাই প্রয়োজন হলে সময় বেশি লাগতে পারে।

নামজারির সরকারি ফি কত?

বর্তমান সরকারি ই-মিউটেশন পোর্টালে আবেদন করার সময় আবেদন ফি ও নোটিশ জারি ফি মিলিয়ে ৭০ টাকা দেখানো হয়েছে।

নামজারি অনুমোদনের পর মিউটেশন খতিয়ান/ডিসিআর সংক্রান্ত ১,১০০ টাকা ফি অনলাইনে পরিশোধের ব্যবস্থা রয়েছে।

ফি পরিবর্তিত হতে পারে, তাই আবেদন করার সময় সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত বর্তমান ফি দেখে পরিশোধ করা উচিত।

নামজারি কোথায় করবেন?

বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে নামজারির আবেদন করা যায়।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সুবিধা সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন সেবা অনলাইনে আবেদন এবং অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে নেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।

সরকারি ই-মিউটেশন পোর্টাল:

ই-নামজারি/মিউটেশন পোর্টাল

ভূমি সেবা সংক্রান্ত সহায়তার জন্য সরকারি ভূমি সেবা হটলাইন ১৬১২২-এ যোগাযোগ করা যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা

জমি কিনেছেন বা উত্তরাধিকারসূত্রে জমি পেয়েছেন—তাহলে দেরি না করে নামজারি করে সরকারি রেকর্ড হালনাগাদ করুন।

দলিল, খতিয়ান, দাগ নম্বর, এনআইডি ও ওয়ারিশ সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে মিলিয়ে আবেদন করুন। কোনো তথ্যের ভুল বা কাগজপত্রের ঘাটতি থাকলে আবেদন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হতে পারে।

আর উত্তরাধিকারসূত্রে জমির ক্ষেত্রে মনে রাখবেন—

জমি ভাগ না করেও সব ওয়ারিশের নাম একই খতিয়ানে যৌথভাবে নামজারি করা যায়।

সরকারি রেফারেন্স

১. ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-মিউটেশন সিস্টেম — নামজারি নিষ্পত্তির ধাপ ও সময়
ই-মিউটেশন আবেদন নিষ্পত্তির ধাপসমূহ

২. ভূমি মন্ত্রণালয়ের নাগরিক সুবিধা — অনলাইন ভূমিসেবা
ভূমি তথ্য বাতায়ন

৩. ভূমি মন্ত্রণালয়ের ই-নামজারি সংক্রান্ত সরকারি পরিপত্র
ই-নামজারি আবেদন নিষ্পত্তির নির্দেশনা

৪. ভূমি মন্ত্রণালয়ের নামজারি, জমাভাগ ও জমা একত্রীকরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা
ভূমি প্রশাসন ম্যানুয়াল

৫. উত্তরাধিকারসূত্রে জমির যৌথ নামজারি বিষয়ে ২০২৫ সালের নির্দেশনার সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন

Updated: August 30, 2026 — 2:22 pm

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *